কূটনৈতিকদের সঙ্গে জামায়াতের ধারাবাহিক বৈঠক: সুষ্ঠু নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে বার্তা
২০১৮ সালের মতো তথাকথিত ‘মিডনাইট নির্বাচন’ বা মধ্যরাতের ভোটের পুনরাবৃত্তি হলে জাতিকে তার চড়া মূল্য দিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন, এবার যেন কোনোভাবেই সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর বসুন্ধরায় জামায়াতে ইসলামীর আমিরের কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবসের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদলটি জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইইউ-এর পক্ষ থেকে ২০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল কাজ করবে।
নির্বাচন বয়কটের আশঙ্কা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের প্রতিটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনেই জামায়াত অংশ নিয়েছে। কেবল ২০১৮ সালের নির্বাচন, যা মিডনাইট ইলেকশন হিসেবে পরিচিত, সেটি আমরা বর্জন করেছিলাম। যখন আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি কোনো নির্বাচনই নয়, তখন দুপুর সাড়ে ১২টায় আমরা সরে দাঁড়াই।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এবার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে এবং নির্বাচন যাতে হাতছাড়া না হয়, সে ব্যাপারে সবাই সচেষ্ট থাকবেন।
নির্বাচনী পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে কোনো অভিযোগ আছে কি না—ইইউ প্রতিনিধিদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও তা এখনই বিদেশিদের জানাতে চান না তারা। তিনি বলেন, ‘এসব সমাধানের দায়িত্ব যাদের, অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন ও সরকার, আমরা প্রথমে তাদের জানাব। সেখানে সমাধান না পেলে তখন জনগণকে জানানো হবে এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও তা জানতে পারবেন।’
এর আগে একই দিন সোমবার সকাল ৯টায় বসুন্ধরা কার্যালয়ে জামায়াত আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, উন্নয়ন সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে জামায়াত আমির জানান, দল ক্ষমতায় গেলে বিশ্বের সব শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা হবে। কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের দিকে না ঝুঁকে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, কিছু মূলধারার গণমাধ্যম একটি বিশেষ পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা গণঅভ্যুত্থানের সময়েও দেখা গেছে। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমকে আমরা রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ মনে করি। তাদের কাজ হলো সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলা। আমরা আশা করি গণমাধ্যম কোনো দলের হয়ে কাজ না করে নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবে।’ এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় নারী কর্মীদের বাধা দেওয়া এবং হিজাব নিয়ে কটূক্তির ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আসন্ন নির্বাচন ও সংস্কার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কারের স্বার্থে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘গত ৫৪ বছরের রাজনীতি দেখে জনগণ হতাশ। তারা পরিবর্তন চায়। সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে আমরা সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত।’ নির্বাচনের পর দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও তিনি দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
এদিকে, সোমবারের বৈঠকগুলোর আগে রবিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুর ২টায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্টেট সেক্রেটারি অ্যালবার্ট টি. গম্বিসের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল জামায়াত আমিরের সঙ্গে বৈঠক করে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রস্তাবিত গণভোট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মার্কিন প্রতিনিধিদল দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ধারাবাহিক এসব বৈঠকে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ড. যুবায়ের আহমেদ, উন্নয়ন টিম লিড দেওয়ান আলমগীর, আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মাহমুদুল হাসান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেনসহ দলের শীর্ষ নেতারা।
মন্তব্য করুন
